আফগানিস্তানের ৪৭ বছর বয়সী দোকানমালিক ফরিদ আহমদ বেশ কয়েক বছর ধরে ক্রমশ অবনতিশীল হৃদরোগ নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। অবিরাম ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট এবং পায়ে ফোলাভাব ধীরে ধীরে তাঁর দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজগুলোকেও কঠিন করে তুলেছিল।
তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটার সাথে সাথে, চিকিৎসকরা উন্নত যান্ত্রিক সহায়তার (উন্নত যান্ত্রিক সহায়তা) সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। একটি সমাধানের সন্ধানে বদ্ধপরিকর ফরিদ আন্তর্জাতিক চিকিৎসার বিভিন্ন বিকল্প খতিয়ে দেখেন এবং অবশেষে ভারতে পাড়ি জমান; সেখানে ডা. হেমন্ত পাথারের তত্ত্বাবধানে তাঁর ‘লেফট ভেন্ট্রিকুলার অ্যাসিস্ট ডিভাইস’ (এল-ভ্যাড) অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। নিচে একটি সাক্ষাৎকারের আদলে ফরিদ তাঁর সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।
ভারতে আসার আগে আপনি কী ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন?
ভারতে আসার আগে, আমি তীব্র হার্ট ফেইলিউরের (হৃদযন্ত্রের অকার্যকারিতা) সমস্যায় জর্জরিত ছিলাম। এমনকি বিশ্রামের সময়েও আমি ক্রমাগত ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট অনুভব করতাম। অল্প দূরত্ব হাঁটাচলা করাও আমার জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছিল; শরীরে জল জমার সমস্যা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে আমাকে ঘন ঘন হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো। আমার জীবনযাত্রার মান ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছিল এবং আমি বুঝতে পারছিলাম যে, শুধুমাত্র ওষুধের ওপর নির্ভর না করে আমার আরও উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন।
ভারতে ডা. হেমন্ত পাথারের (ডা. হেমন্ত পাথারে) সম্পর্কে আপনি কীভাবে জানতে পারলেন?
আমি একজন 'মেডিকেল ফ্যাসিলিটেটর' বা চিকিৎসা সহায়তাকারীর মাধ্যমে ডা. হেমন্ত পাথারের সম্পর্কে জানতে পারি; এই ব্যক্তি মূলত আন্তর্জাতিক রোগীদের বিশেষায়িত হৃদরোগ চিকিৎসার সন্ধান পেতে সহায়তা করে থাকেন। এছাড়া আমি অনলাইনেও ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েছিলাম এবং উন্নত হার্ট ফেইলিউর চিকিৎসার ক্ষেত্রে—যার মধ্যে 'এল-ভ্যাড ইমপ্লান্টেশন' বা প্রতিস্থাপনও অন্তর্ভুক্ত—তাঁর অভিজ্ঞতার বিষয়ে বিস্তারিত পড়েছিলাম। অন্যান্য রোগীর কাছ থেকে তাঁর চিকিৎসার সাফল্যের গল্প শুনে আমি আমার নিজের চিকিৎসার জন্য তাঁকেই বেছে নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত হয়েছিলাম।
অন্য কোনো দেশে না গিয়ে আপনি আপনার চিকিৎসার জন্য ভারতকে কেন বেছে নিলেন?
ভারতে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে মূলত তিনটি বিষয় কাজ করেছিল: চিকিৎসার সহজলভ্যতা, সাশ্রয়ী খরচ এবং এখানকার চিকিৎসকদের বিশেষ দক্ষতা। অন্যান্য দেশের তুলনায়, ভারত অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত খরচে উন্নত হৃদরোগ চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং অত্যন্ত অভিজ্ঞ সার্জনদের সেবা প্রদানের সুযোগ করে দেয়।
তাছাড়া, আন্তর্জাতিক রোগীদের জন্য বিশেষ সেবার ব্যবস্থা থাকায় আমার এবং আমার পরিবারের পক্ষে যাতায়াত ও হাসপাতালের আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো সমন্বয় করা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলাম যে, দীর্ঘ অপেক্ষার ঝামেলা ছাড়াই আমি এখানে অত্যন্ত উচ্চমানের চিকিৎসা সেবা লাভ করতে পারব।
ডাঃ হেমন্ত পাথারের সাথে যখন আপনার প্রথম দেখা হলো, তখন আপনার কেমন লেগেছিল?
ভারতের কার্ডিওভাসকুলার সার্জন ডাঃ হেমন্ত পাথারের সাথে সাক্ষাৎ করাটা আমার জন্য অত্যন্ত আশ্বস্তকারী একটি অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি আমাকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে অভ্যর্থনা জানালেন এবং আমার চিকিৎসার ইতিহাস ও উদ্বেগগুলো বোঝার জন্য যথেষ্ট সময় দিলেন। তাঁর শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী আচরণ আমার মনের ভয় দূর করতে সাহায্য করেছিল।
আমার কাছে বিষয়টি খুবই প্রশংসনীয় মনে হয়েছে যে, তিনি আমার কথাগুলো অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শুনেছেন এবং আমাকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করেছেন; এর ফলে পরামর্শ গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটি আমার কাছে ভীতিকর না হয়ে বরং একটি পারস্পরিক সহযোগিতামূলক আলোচনার মতো মনে হয়েছে। তাঁর স্পষ্ট যোগাযোগশৈলী এবং রোগীর প্রতি তাঁর একান্ত মনোযোগী দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়াটির ওপর আস্থা রাখতে সাহায্য করেছে; পাশাপাশি, আমার শারীরিক অবস্থা এবং পরবর্তী চিকিৎসার ধাপগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতেও আমি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছি।
চিকিৎসক আপনার শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসার পরিকল্পনাটি কতটা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন?
ডা. পাথারে অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় আমার শারীরিক অবস্থাটি ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বর্ণনা করেছিলেন যে, কীভাবে আমার হৃদপিণ্ডের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং কেন একটি ‘লেফট ভেন্ট্রিকুলার অ্যাসিস্ট ডিভাইস’ (বাম নিলয় সহায়ক যন্ত্র) রক্ত সঞ্চালনে সহায়তা করবে।
তিনি অস্ত্রোপচারের পরবর্তী সুবিধাগুলো, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলো নিয়েও আলোচনা করেছিলেন। বিভিন্ন চিত্র বা ডায়াগ্রামের ব্যবহার এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা আমাকে পুরো প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি বুঝতে সাহায্য করেছিল, যার ফলে আমি একটি সুচিন্তিত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়েছিলাম।
অস্ত্রোপচারের সময় এবং হাসপাতালে অবস্থানকালীন আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
অস্ত্রোপচারের আগে বিষয়টি বেশ ভীতিকর মনে হচ্ছিল, কিন্তু হাসপাতালের দলটি আমাকে অত্যন্ত জোরালো মানসিক সহায়তা প্রদান করেছিল। অস্ত্রোপচারের দিন নার্স ও চিকিৎসকরা আমাকে আশ্বস্ত করেন এবং পুরো পরিবেশটি শান্ত ও স্থির রাখেন। আমি ডা. হেমন্ত পাথারের তত্ত্বাবধানে ‘লেফট ভেন্ট্রিকুলার অ্যাসিস্ট ডিভাইস’ (এল-ভ্যাড) অস্ত্রোপচার করাই; আমি যে অত্যন্ত অভিজ্ঞ চিকিৎসকের হাতে রয়েছি—এই বিষয়টি আমাকে দারুণ আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। অস্ত্রোপচার-পরবর্তী সময়ে আমি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) অবস্থান করি, যেখানে আমার শারীরিক অবস্থার ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছিল।
হাসপাতালে অবস্থানকালীন সময়ে আমার ধীরলয়ে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া, ফিজিওথেরাপি এবং এল-ভ্যাড নিয়ে জীবনযাপনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও পরামর্শ প্রদান করা হয়। হাসপাতালের কর্মীরা ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী, সহানুভূতিশীল এবং যেকোনো প্রয়োজনে সর্বদা পাশে থাকার জন্য প্রস্তুত। তাঁদের আন্তরিক সেবা ও যত্নের কারণেই আমার মতো একটি কঠিন অভিজ্ঞতা অনেক বেশি সহনীয় ও সহজ হয়ে উঠেছিল।
আপনি কি আফগানিস্তানের অন্য রোগীদের কাছে ডা. হেমন্ত পাথারে এবং ভারতকে সুপারিশ করবেন? কেন?
হ্যাঁ, আমি অবশ্যই অন্য রোগীদের কাছে ডা. পাথারে এবং ভারত—উভয়কেই সুপারিশ করব। আমার চিকিৎসার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ইতিবাচক ছিল এবং পুরো চিকিৎসা চলাকালীন আমি অত্যন্ত যত্নশীল ও সহানুভূতিপূর্ণ সেবা পেয়েছি।
চিকিৎসাবিষয়ক দক্ষতা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং সহযোগী কর্মীদের সমন্বয়ে সেখানে সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। আফগানিস্তানের যেসব রোগীর উন্নত হৃদরোগ চিকিৎসার সুযোগ সীমিত, তাদের জন্য ভারতে চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়টি একটি জীবনরক্ষাকারী বিকল্প হতে পারে।
যারা আপনার মতোই একই ধরনের হৃদরোগে ভুগছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আপনি কী বার্তা দিতে চান?
আমার বার্তা হলো—কখনোই আশা হারাবেন না। হার্ট ফেইলিউর বা হৃদযন্ত্রের অকার্যকারিতা নিয়ে জীবনযাপন করাটা মাঝে মাঝে অত্যন্ত কষ্টকর বা হতাশাজনক মনে হতে পারে, কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি এখন এর অনেক সমাধান নিয়ে এসেছে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা এবং অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের ওপর আস্থা রাখা আপনার অবস্থার পরিবর্তনে এক বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে।
আমি রোগীদের উৎসাহিত করব যেন তারা চিকিৎসার বিষয়ে সর্বদা খোঁজখবর রাখেন, চিকিৎসকদের বিভিন্ন প্রশ্ন করেন এবং চিকিৎসার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নিজেদের পরিবারের সদস্যদেরও যুক্ত রাখেন। সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এবং মানসিক দৃঢ়তা; তবে সুস্থ হয়ে ওঠাটা অবশ্যই সম্ভব। আজ আমি নিজেকে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেক বেশি আশাবাদী অনুভব করছি।
শেষ কথা
ফরিদ আহমদের এই অভিজ্ঞতাটি সঠিক সময়ে চিকিৎসার উদ্যোগ গ্রহণ এবং উন্নত হৃদরোগ চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ার গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরে। এখন শারীরিক শক্তি ফিরে পাওয়ায় এবং মনে নতুন আশার সঞ্চার হওয়ায়, ফরিদ এখন একটি হৃদবান্ধব জীবনধারা বজায় রাখা এবং নিজের প্রিয়জনদের সাথে আনন্দঘন সময় কাটানোর দিকেই মূলত মনোযোগ দিচ্ছেন। তার এই গল্পটি গুরুতর হার্ট ফেইলিউরে আক্রান্ত রোগীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে; এটি প্রমাণ করে যে—সঠিক চিকিৎসাবিষয়ক নির্দেশনা, সহযোগী সেবা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে হৃদরোগের মতো অত্যন্ত জটিল সমস্যাগুলোকেও সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
